জয় হিন্দ ( নয় হিন্দি )
কথায় আছে জোর যার মুলুক তার। বর্তমানে নতুন সরকার ঠিকমতো সিংহাসনে বসতে না বসতেই নতুন বিতর্ক উজ্জাপন হয়েছে হিন্দি ভাষা সর্ব ভারতীয় সরকারি পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলক করার খসড়া প্রকাশ্যে আসায়। গৈরিক দুরভিসন্ধি নিয়ে শুরু হয়েছে বুদ্ধিজীবী মহলে চাপানউতোর, ধিক্কার, প্রতিবাদ ও নানাবিধ তরজা বিশেষ করে দক্ষিণী রাজ্যগুলোতে আর আমাদের মোদের গরব মোদের আশা...আমরি বাংলায়।
বাংলায় ( এখনো পশ্চিমবঙ্গ ) আমরা ছোটবেলা থেকেই অভ্যস্ত কোনো হিন্দিভাষী লোক দেখলেই হিন্দুস্থানী বলতে, যেন আমরা কেউ হিন্দুস্থানের বাসিন্ধা নই। আবার অনেকেই সচরাচর মুসলিমদের বিপরীত শব্দ বাঙালি বলে যেন মুসলিম সম্প্রদায় মাত্রই অবাঙালি ।এগুলো শুধু আমাদের মুদ্রা দোষ নয়, হিন্দি বলয় মানেই গো বলয় বা মোটা দাগের দেহাতি, খোট্টা, গারোয়ানী culture আর বাঙালি মানেই উচ্চ সংস্কৃতি এই শ্রেণী বিভেদ বা intellectual polarisation করা আমাদের জন্মগত অধিকার।
নব্বুই দশকের আগে অবধি যাদের বাল্যকাল তারা অনেকেই জানেন যে হিন্দি সিনেমা দেখা অথবা হিন্দি গান আওড়ানো গড়পড়তা বাঙালি পরিবারে একপ্রকার অপসঙ্গস্কৃতি বলেই গ্রাহ্য হতো। অভিভাবকরাও একপ্রকার লুকিয়ে চুরিয়েই রঙ্গলি অথবা নুক্কডের মতো ধারাবাহিক দেখতেন। একমাত্র দূরদর্শনের ন্যাশনাল নিউজ সম্প্রচারের সময় রাশ কিছুটা আলগা ছিল। আম বাঙালির হিন্দির দৌড় বোঝা যেত স্টেশনে কুলি, জঙ্গল সাফ করতে মিতা, অথবা উড়ে জলের ভারির সাথে যখন দরকষাকষি চলত। শহরের স্কুল অথবা কনভেন্ট ছাড়া খুব কমই ছাত্রছাত্রীরা হিন্দিভাষী সহপাঠীর সাহচর্য পেত। হিন্দি medium কিছু স্কুলের ছাত্রদের সাথে একমাত্র খেলাধুলো ছাড়া মেলামেশায় বাড়ি থেকে চরম আপত্তি থাকতো। বাঙালি দম্ভের আস্ফালনে যখনই রাস্তা ঘাটে, ট্রেনে বাসে কোন হিন্দিভাষী জুটত তাকে নিয়ে খোরাখ একপ্রকার নিত্যনৈমিত্তিক ছিল। পাশের রাজ্য বিহারের বাসিন্দাদের আনাগোনা যত বাড়তে শুরু করলো বাঙালিও কিছুটা হিন্দি জাহির করতে অবজ্ঞা করেও অদ্ভুত উচ্চারণে বলতে শুরু করলো (bollywood এ বাঙালিদের কমিক রিলিফ )।
কয়েক যুগ পরে বর্তমানে দাঁড়িয়ে বাঙালি আজ হিন্দিভাষী সম্প্রদায়ের সাথে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করছে। বাঙালি চিরকালই মেধা নির্ভর আর ব্রিটিশ আমল থেকে শ্রেষ্ঠ কেরানীগিরি পন্থা অবলম্বন করে বণিক অবাঙালি সম্প্রদায়কে ধান্দাবাজ বলে এসেছে (ভারতবর্ষে ধান্দা কথাটা একমাত্র বাঙলাতেই খারাপ অর্থে ব্যাবহার হয় )। একে একে শ্রম নির্ভর, কারিগরি শিল্প নির্ভর সমস্ত কাজে যখন অবাঙালীরা ( পড়ুন হিন্দিভাষী রা ) একাধিপত্য বিস্তার করে বাংলাতে জাঁকিয়ে বসেছে তখন আম বাঙালিরা সরকার কে দোষ দিয়ে, বিপ্লব দীর্ঘজীবী করে চাকরির জন্য হাহুতাশ করেছে।
অনেক দিন পর্যন্ত বাংলায় শিল্প মানে বাঙালি শুধু কৃষ্টি, রবীন্দ্রসংগীত, গনেশ পাইন এসবি বুঝতো। তাদের যদি বাণিজ্যের ভবিষৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হতো, তারা বলতো যারা ক্লাসে টেনেটুনে পাস করে তারাই বাণিজ্য নিয়ে পড়ে দোকানে খাতা সারে অথবা ব্যবস্যা নাকি বাঙালির রক্তে নেই, ওর জন্য অনেক মূলধন লাগে। তারচেয়ে বরং কোনোক্রমে স্কুল টিচার হতে পারলে বা ভাগ্যক্রমে WBCS লাগাতে পারলেই life settled। এরপর এলো private engineering কলেজ আর ম্যানেজমেন্ট স্কুল যখন মেধার জোরে বাঙালি ভালো rank করে অন্য রাজ্যে অথবা বিদেশ পাড়ি দিলো আর বাংলায় আপাত কম rank এর অন্য রাজ্যের ছাত্ররা ভিড় করলো। এই সময়ের বাঙালিরা অনর্গল হিন্দি বলতেই বেশি সাচ্ছন্দ বোধ করে কারণ তাদের ক্যাম্পাসে একপ্রকার miniature ভারত, সেখানে আবার বেশি ইংলিশ কপচালে ট্যাশ বলে ragged হতে হবে।
কথা হচ্ছিল সরকারি স্কুল নিয়ে কিন্তু এই চিত্রটা যদি দেখা যাক private CBSE, ICSE অথবা ইংরিজি মিডিয়াম সরকারি নাম করা স্কুলে অনেক দিন থেকেই 3rd language অথবা কিছু ক্ষত্রে 2nd language ( সেনা স্কুল ) হিন্দিকে ( সংস্কৃতকে নাকি backdated আর scope কম তাই option নেই ) সাচ্ছন্দেই গ্রহণ করছে সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাঙালি সন্তানেরা। যুক্তি হলো, higher studies এর জন্য তো অন্য রাজ্যে যেতেই হবে, আবার যদি IPS, IAS এ বসে তখন কোথায় posting হয় ( ভারতে হিন্দি ভাষাটা 60% রাজ্যে সাধারণ মানুষ বোঝে ) অথচ মজার কথা সেই সন্তানের অভিভাবকেরা ( যারা সরকারি স্কুলের নামে নাক সিঁটকায় ) সামাজিক দেওয়াল ভরিয়ে শুধু বলছে হিন্দি জোর করে চাপিয়ে অপরিসীম ক্ষতি করতে চাইছে আমাদের প্রজন্মের, বাঙালি সত্তার ওপর কুঠারাঘাত বসাচ্ছে রাষ্ট্র। হিন্দি কোনো দিনই রাষ্ট্রিয় ভাষা ছিলনা যেমন সত্যি তেমনি এটা বাস্তব বাংলার বাইরে বেড়াতে গেলেও হিন্দি না উচ্চারণ করা দুস্কর। অবশ্যই বাংলা উচ্চারণে হিন্দি বলে কাজ চালন যেতেই পারে তার জন্য হিন্দি শেখাটা বাড়াবাড়ি মনে হতেই পারে, কিন্তু যে দেশের মানুষ যে common ভাষায় কথা বলে ( পৃথিবীর তিন নম্বর কথিত ভাষা ) তাকে কুপমন্ডুকের মতো দূরে সরিয়ে রেখে বাঙালির কি খুব লাভ হয়েছে ?? National arena তে হিন্দি না জানলে কলকে পাওয়া যায়না আর কেউ না বুঝুক আমাদের মাননীয়া বোঝেন, যার হিংলায় ভাষণের জন্য বাঙালিরা trolled হয়। প্রণব বাবুও একসময় বুঝেছেন যে আম ভারতীয়র কাছে পৌঁছতে হলে হিন্দিটা হিন্দির মতোই বলা প্রয়োজন, আর বাঙালির ইংলিশ surrogation সব স্তরে গ্রহনযোগ্য হয়না।শুধু ভাষাটাকে অবজ্ঞা করে কোনো বাঙালি বামপন্থী দেশকে lead করতে পারলোনা, কেরালিয়ানরা তবু ভাঙা ভাঙা বলে অযোগ্য হয়েও ছড়ি ঘোরালো।
স্বাধীনতার আগে বোধহয় বাঙালি অনেক উদার মনস্ক ছিল তাই বলা হতো বাঙালিরা ভারতের চেয়ে একদিন এগিয়ে। স্বামী বিবেকানন্দ থেকে নেতাজি আসমুদ্র হিমাচল হিন্দিতেই ভাষণ দিয়েছেন। বিদ্যাসাগর থেকে রামমোহন বহু বিজাতীয় ভাষা শুধু শেখাই নয় রীতিমতো পন্ডিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ হিন্দি dialect নিয়ে experiment শুধু নয় সাহিত্য সৃষ্টিও করেছেন। সমগ্র ভারতে আজ অবধি যে সব বাঙালি জনমানসে প্রভাব বিস্তার করেছেন সবাই হিন্দিতে খুবই সচ্ছল, সৌরভ গাঙ্গুলী থেকে মিঠুন চক্রবর্তী সবারই দেশ জোড়া ফ্যান। প্রবাসী বাঙালিরা যেখানে স্বকীয়তার সঙ্গে bollywood স্টার হবে, হিন্দিতে লিরিক্স লিখবে, কাব্য থেকে স্ক্রিপ্ট, direction সবে হিন্দি শেখার লাভ নেবে, বাংলার বাঙালিরা শুধু হিন্দি মানে গরক্ষকের ভাষা, অতি স্থূল ভাষা বলে বাংলাটাও ঠিকঠাক বলবেনা আর anglo বং status showoff করবে। গুজরাতি থেকে মারাঠিরা দেশ চালাবে হিন্দি করায়ত্ত করে আর বাঙালি ক্রমশ ছুৎ মার্গ করে দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে trolled হবে। দক্ষিণী রাজ্যে হিন্দি বিদ্বেষ অনেকদিনের কারণ সেখানকার আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি মানুষকে শুধু ভাষা দিয়ে তাদের একাধিপত্য বজায় রেখেছিল। কিন্তু নতুন প্রজন্মকে এখন হিন্দিতে সরগর হতেই হচ্ছে কারণ তাদের অন্য রাজ্যে জীবিকাসূত্রে যেতে হচ্ছে। এরকম অচলায়তন কিন্তু বাংলা “Liberal” মনস্কতার পরিপন্থী । বাংলার বাঙালি যেদিন হিন্দিতে জ্ঞানপিঠ পাবে অথবা বাঙালি নেতা যেদিন সারা দেশে হিন্দিতে ভাষণ দিয়ে মানুষকে মাতাবে যেভাবে এখন বাঙালি গায়কেরা সারা দেশে এত জনপ্রিয়, সেদিন বোধহয় এত হিন্দি নিয়ে রে রে করে না উঠে rationally ভাব্বে বাঙালি। বাঙালি হিন্দি শিখলে হিন্দি পড়াবার কত সর্বভারতীয় স্তরে শিক্ষকতার সুযোগ হতে পারে একটু চিন্তা করা যাক।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি কে হিন্দি শিক্ষা কখনোই challenge করতে পারবেনা বরং আমাদের চারপাশে এত হিন্দিভাষীদের বাংলায় থাকতে হলে বাংলা পড়তে হবে, বাংলা মনন বুঝতে হবে ( atleast তারাও বঞ্চিত হচ্ছে এত বড় ভান্ডার থেকে ) আর তখনই তারাও বাঙলা বলে গর্বিত হবে যাতে আমাদের তাদের সঙ্গে বাঙলাতেই কথা বলতে পারি। ব্রিটিশ উপনিবেশের ফলে যত ক্ষতিই হয়ে থাকুক, ভাষাজ্ঞানটাই লাভের লাভ হয়েছে যেটা সর্বজনবিদিত ( sorry মাঝখানে প্রাইমারি থেকে তুলে ক্ষতি হয়েছে কয়েকটা generation এর ). তাই ভাষা সন্ত্রাস বোধহয় নিজের ভাষাকে অনেক সমৃদ্ধ করে ( যে ভাবে আরবি, ফার্সি, এখন বাংলারি অঙ্গ ) তার জলজ্যান্ত প্রমান ইংলিশ ( ইউরোপিয়ান সমস্ত ভাষা থেকে উপনিবেশিক ভাষায় মিলেমিশে একাকার )। শেষে বলি যারা হিন্দু , হিন্দি, হিন্দুস্থান জুজুতে ভয় পাচ্ছ যেন আবার ভাষা আন্দোলনের সংকটের সামনে তাদের নিশ্চই অবগত আছে যে এই মুহূর্তে Hongkong এর cantonese ভাষা আন্দোলন কিভাবে দমন করা হচ্ছে। ( Chinese Mandarin চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কারণ communism এক জাতি, এক প্রাণ, এক ভাষায় বিশ্বাসী ) হিন্দিকে common language for communication মানতে কি অসুবিধে যখন তা গণ্য হয় বিশ্বের দরবারে ( ফ্রেঞ্চ, জার্মান, চীন বা লাতিন দেশনায়কের মতো UN অথবা বিদেশে যেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশীয় হিন্দিতেই প্রতিনিধিত্ব করেন তাঁর মাতৃভাষা গুজরাটি কে বিন্দুমাত্র খাটো না করে )
জয় বাংলা ( conjunctivitis নয় )
প্রত্যয় সুর
